রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

ম্যাক্সিম গোর্কির মা ভার্সাস বাংলার গ্রামীণ এক সংগ্রামী মা [a true story] জীবন সংগ্রামের গল্প # ৫৩




মা! হৃদতন্ত্রী নেচে ওঠা একটি শব্দ, যেন বুকের মাঝে বয়ে চলা কোন শান্ত জলাধার। মানুষ ছাড়াও অন্যান্য হিংস্র প্রাণিদের মধ্যেও ‘মায়ের’ স্বভাব অনেকটাই ‘মাতৃসুলভ’। যে হিংস্র বাঘটি এই মাত্র একটি হরিণকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে খেয়ে আসলো, তাকেও তার ছোট্ট শাবক কিভাবে কান-লেজ কামড়াচ্ছে ও তার ‘হিংস্র মা’ ছোট্ট শাবককে নানাবিধ অনুসঙ্গে বা শব্দ করে তার প্রতি-উত্তর দিচ্ছে, তা এখন স্যাটেলাইট টিভির কল্যাণে প্রত্যহ আমরা প্রত্যক্ষ করছি। ‘মা’দের নিয়ে এ অঞ্চলে কম গল্প-উপন্যাস-সিনেমা তৈরী হয়নি। এমনকি বিশ্বসাহিত্যে ম্যাক্সিম গোর্রির ‘মা’ উপন্যাস অন্যতম পাঠকপ্রিয় ও পঠিত উপন্যাস হিসেবেও খ্যাত। ভারতের বিহারে গতবছর তৃতীয় শ্রেণির ট্রট্রেনযাত্রী জনৈক মহিলার হঠাৎ করে ‘টয়লেটে’ সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়ে, আকস্মিকভাবে তা টয়লেটের ফোঁকর দিয়ে নিচে লাইনে পড়ে গেলে, সন্তানের টানে ঐ ‘মা’ কোন কিছু চিন্তা না করেই চলন্ত ট্রেন থেকে লাইনে ঝাপ দিয়ে নিজে আহত হলেও, সদ্য জন্ম নেয়া সন্তানটি ট্রেনের ট্রাকে থাকে অক্ষত! ‘মা’-এর ‘চৌম্বকীয় অলৌকিক’ টান-ই সম্ভবত চলন্ত ট্রেন থেকে নিচে পড়ে যাওয়া সন্তানকে অক্ষত রেখেছিল! এখন পত্র-পত্রিকায় মাঝে মধ্যে পরকিয়ার কারণে সন্তান ফেলে ঘর-ছাড়া কিংবা প্রেমিকের সহযোগিতায় নিজ সন্তান হত্যার দু’য়েকটি ঘটনাও প্রকাশিত হচ্ছে, যা নিতান্তই আমাদের বর্তমান‘ক্ষয়িষ্ণু ভোগবাদী’ সমাজের সাময়িক সংক্রমণ। বিশ্বের প্রায় সকল মানুষ ও প্রাণিই ‘মা’কে কম-বেশী ভালবাসে।

আস্টুরিয়ান, হিন্দী ও বাঙালিরা মাকে ‘মা’বললেও, অন্য জাতির মানুষেরা মাকে যথাক্রমে Afrikaans=Moeder/Ma, Albanian=Nënë, Mëmë, Arabic=Ahm/Ummi, Aragones=Mai, Asturian=Ma, Aymara=Taica, Azeri=Ana, Basque=Ama, Belarusan=Matka, Bergamasco=Màder, Bolognese=Mèder, Bosnian=Majka, Brazilian Portuguese=Mãe, Bresciano=Madèr, Breton=Mamm, Bulgarian=Majka, Byelorussian=Macii, Calabrese=Matre, Mamma, Caló=Bata, Dai, Catalan=Mare, Cebuano=Inahan, Nanay, Chechen=Nana, Croatian=Mati, Majka, Czech=Abatyse, Danish=Mor, Dutch=Moeder, Moer, Dzoratâi=Mére, English=Mother, Mama, Mom, Esperanto=Patrino, Panjo, Estonian=Ema, Faeroese=Móðir, Finnish=Äiti, Flemish=Moeder, French=Mère, Maman, Frisian=Emo, Emä, Kantaäiti, Äiti, Furlan=Mari, Galician=Nai, German=Mutter, Greek=Màna, Griko=Salentino, Mána, Hawaiian=Makuahine, Hindi=Ma, Maji, Hungarian=Anya, Fu, Icelandic=Móðir, Ilongo=Iloy, Nanay, Nay, Indonesian=Induk, Ibu, Biang, Nyokap, Irish=Máthair, Italian=Madre,Mamma, Japanese=Okaasan, Haha, Judeo Spanish=Madre, Kannada=Amma, Kurdish Kurmanji=Daya, Ladino=Uma, Latin=Mater, Leonese=Mai, Ligurian=Maire, Limburgian=Moder, Mojer, Mam, Lingala=Mama, Lithuanian=Motina, Lombardo Occidentale=Madar, Lunfardo=Vieja, Macedonian=Majka, Malagasy=Reny, Malay=Emak, Maltese=Omm, Mantuan=Madar, Maori=Ewe, Haakui, Mapunzugun=Ñuke, Ñuque, Marathi=Aayi, Mongolian=`eh, Mudnés=Medra, mama, Neapolitan=Mamma, Norwegian=Madre, Occitan=Maire, Old Greek=Mytyr, Parmigiano=Mädra, Persian=Madr, Maman, Piemontese=Mar, Polish=Matka, Mama, Portuguese=Mãe, Punjabi=Mai, Mataji, Pabo, Quechua=Mama, Rapanui=Matu'a Vahine, Reggiano=Mèdra, Romagnolo=Mèder, Romanian=Mama, Maica, Romansh=Mamma, Russian=Mat', Saami=Eadni, Samoan=Tina, Sardinian=Mama, Sardinian Campidanesu=mamai, Sardinian Logudoresu=Madre, Mamma, Serbian=Majka, Shona=Amai, Sicilian=Matri, Slovak=Mama, Matka, Slovenian=Máti, Spanish=Madre, Mamá, Mami, Swahili=Mama, Mzazi, Mzaa, Swedish=Mamma, Mor, Morsa, Swiss German=Mueter, Telegu=Amma, Triestino=Mare, Turkishr=Anne, Ana, Valide, Turkmen=Eje, Ukrainian=Mati, Urdu=Ammee, Valencian=Mare, Venetian=Mare, Viestano=Mamm', Vietnamese=me, Wallon=Mére, Welsh=Mam, Yiddish=Muter, Zeneize=Moæ নামে সম্বোধন করে থাকে।

পৃথিবীতে অনেক উচ্চশিক্ষিত মহান মায়ের ইতিহাস রচিত হলেও, আমি এমন গ্রামীণ ‘সাক্ষরতাহীন’ এক মাকে জানি, যে তার সন্তানকে ‘মানুষ’ করার জন্যে জীবন বাজি রেখে জীবনযুদ্ধে নেমেছিল এবং সমাজের নানা ভ্রুকুটি সয়ে ৭-সন্তানকে ‘সুশিক্ষিত’ করেছিল এক প্রতিকুল বৈরী সমাজে। আজকের ‘মা’দের অনুপ্রেরণাদায়ক এমন মায়ের গল্প হচ্ছে এটি।

গল্প! আসলেই গল্প কি?
:

এই মায়ের বসতি ছিল বরিশাল জেলার নিতান্তই এক চরাঞ্চলে। যেখানে গ্যাস, বিদ্যুৎ, টেলিফোন তখনতো নয়-ই, এখনো আলোর মুখ দেখেনি। প্রায় ৯৮% সাক্ষরতাহীন এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ জেলে ও চরাঞ্চলের কৃষক সম্প্রদায়ের, অন্ধকার আর কুসংস্কারই যাদের জীবন-চিত্র। মেয়েরাতো নয়ই, ছেলেরাও তখনো সেখানে স্কুলে যেত না ঐ সময়। স্কুলও ছিল দুর্গম পথে ও দূরবর্তী। যে মায়ের কথা বলছি, তার বিয়ে হয় বাল্যকালে, কালক্রমে ৭-সন্তানের জননী হন তিনি। স্বামী ছিল অনেক ধানী জমির ধনী কৃষক সহজ সরল ভুমি মালিক। কিন্তু গ্রামীণ নগ্ন ষড়যন্ত্রে স্বামীর প্রায় সকল জমি হারাতে হয় মামলা-মোকদ্দমায়। ভিটে থেকে উৎখাতের জন্যে স্বামীর শেষ সম্বল গরু-মহিষগুলোকে ‘বিষ প্রয়োগে’ হত্যা করা হয় একদিন, বাড়ি থেকে করা হয় যড়যন্ত্রমূলকভাবে উৎখাত। জমি-গরু হারিয়ে স্বামী কিংকর্তব্যবিমুখ হয়ে অনেকটা দেশান্তরি হন কোলকাতায়।
:
কিন্তু জীবন সংগ্রামী গ্রামীণ মা ৭-সন্তানকে মানুষ করার দৃঢ় প্রত্যয়ে ‘রাস্তায় নামেন’। বড় মেয়েকে (যার বয়স এখন ৮৭-বছর) অনেক দূরের দুর্গম পথে স্কুলে পাঠান, যে কিনা ঐ স্কুলের প্রথম ছাত্রী। ২-ছেলেকেও অন্যের বাড়ি ‘লজিং’রেখে পড়াতে থাকেন নিজের হঠাৎ আসা অসচ্ছলতার কারণে। সন্তানদের মানুষ, সংসার চালানো ও লেখাপড়া করানোর জন্যে সদ্য চালু হওয়া সরকারি প্রকল্প ‘পরিবার পরিকল্পনা’ বিভাগে চাকুরী নেন মা। কিন্তু অসেচতন সাক্ষরতাহীন কুসংস্কারে ভরা গ্রামের মানুষ একজন মহিলার ‘পরিবার পরিকল্পনা’ বিভাগে চাকুরী করে ছেলে ও মেয়েকে লেখাপড়া করানোকে ‘ন্যাক্কারজনক’ হাস্যকর দৃষ্টিতে দেখতে থাকেন। নিজ আত্মীয়রাও ‘আল্লাহ ও ধর্ম বিরোধী’ বিভাগে চাকুরী করার অপরাধে তাকে ধিক্কার ও অনেকটা একঘরে করেন সমাজে। গ্রামীণ কয়েকজন সক্ষম গৃহবধুকে ‘জন্মনিয়ন্ত্রণ’ কার্যক্রম গ্রহণে থানা সদরে নিয়ে যাওয়ার পথে হঠাৎ ঝড়ে ‘নৌকাডুবি’তে ৩-জন মহিলা ও ২-শিশু মারা গেলে, ‘পাপ কাজের জন্য গজবী মৃত্যুর’ জন্যে কয়েকটি গ্রামের মানুষ এই মা’র বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং তার নামে নানা অপপ্রচার, কুৎসা ও পেশাগত কাজে বাঁধার সৃষ্টি করে, তার ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ঐ মা দমে না গিয়ে সরকারিভাবে এর মোকাবেলা করেন এবং নিজ উদ্যোগে স্থানীয় বাজারে সরকারি উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এনে জনমত গঠনের জন্য সভা করতে সক্ষম হন।
:
এভাবে নানা বন্ধুর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঐ সংগ্রামী ‘মা’ তার সব সন্তানকে মানুষ করেন, ৩ মেয়েকে বিয়ে দেন এবং নাতি-পুতিদের নিয়ে ‘যৌথ পরিবার’ ধরে রাখতে করে সক্ষম হন। ৪-সন্তানকে তিনি উচ্চ শিক্ষিত করে বিদেশে প্রেরণ করেন। তার এলাকায় তার প্রথম সন্তান স্কুলে যাওয়া মেয়েকেও তিনি ‘গ্রাজুয়েট’ বানান। বিদেশে অবস্থানকারী সন্তানরা তার নামে টাকা পাঠালে, তিনি ঢাকা শহরে ঐ সময়ে রাস্তাঘাটহীন একটি এলাকায় নিজে জমি ক্রয় করেন এবং নিজে ‘অক্ষরজ্ঞানহীন গ্রামীণ অজপাড়াগাঁয়ে’র মহিলা হয়েও, একটি ৬-তলা বাড়ি এককভাবে নির্মাণ করেন। মালপত্র ক্রয় ও বাড়ির হিসাব রাখার জন্যে তিনি অন্য মানুষের সাহায্য নিতেন। ব্যাংক একাউন্টে স্বাক্ষর করতে না পারা ও নিজে হিসাব লিখে রাখতে না পারার দুঃখবোধে সাক্ষরতার ইচ্ছে তার মনে প্রবলভাবে জাগ্রত হয় এবং প্রায় ৮০-বছর বয়সে নাতিদের কাছে পড়ালেখা শুরু করেন। ৩-৪ মাসের চেষ্টায় সে হিসাব রাখা ও দৈনিক পত্রিকা পড়া শেখেন। 
:
শেষ জীবনে তিনি একজন ‘সফল নারী’ হিসেবে ঢাকা শহরে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় নিজ হাতে নির্মিত বাড়িতে ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে’বসবাস করতেন। টেলিফোনে তিনি প্রায়ই বিদেশ অবস্থানকারী ছেলে, বউ, নাতিদের সাথে কথা বলতেন। নিজ খরচে তিনি হজ্বব্রত পালনসহ কয়েকবার বিদেশ ভ্রমন করেন। নিজ অন্ধকার দ্বীপগ্রামে গেলে তিনি গ্রামীণ অসহায় মহিলাদের নিজের সংগ্রামী জীবনের গল্প শোনাতেন এবং বিপদে সাহস নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্ধুদ্ধ করতেন। এই ‘মার’ ৭-সন্তানই এখন দেশে বিদেশেসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রতিষ্ঠিত। তার ৭ সন্তান এখন মায়ের বর্ণিত গল্পে গর্বিত। এই লেখক হয়তো তার মায়ের জীবন সংগ্রামের গর্বের কাহিনি এ জন্যে লিখতে পারছে যে, তার মা সংগ্রাম করে তাকে পড়ালেখা শিখিয়েছে। ঐ অঞ্চলের অন্য দশজন সাধারণ গ্রামীণ মায়ের মত এই লেখকের মা হলে, এই লেখক হয়তো এখন ঐ দুর্গম দ্বীপগ্রামের কোন ‘জেলে’ কিংবা সাধারণ ‘কৃষক’ হতেন, একজন সমাজ সচেতন লেখক হতেন না।


বিশ্বের সকল সচেতন মানুষ চেনে ম্যাক্সিম গোর্কির মা উপন্যাসের ‘পাভেল ভলাসভের মা’কে। যে কিনা সন্তান পাভেলের জীবন চিত্রায়নের জন্য পুলিশের ধাক্কা খেয়েও ধকধকে চোখ জ্যোতিষ্মান রাখে, তার চেতনা প্রাক্তন রুশ সমাজের বুককে শতদীর্ণ করে হৃদয় জ্বলে ওঠে সহস্র শিখায়, যার আলোকচ্ছটা ছড়ায় সোভিয়েত সমাজে! এদেশের অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে ঘরে ঘরে হত্যা, ধর্ষণ আর নির্যাতনে নিত্য পিষ্ট নারীদেরকে বলবো, চলুন আমরা উপরে বর্ণিত ‘মা’-এর পথকে অনুসরণ করি এবং নিজ সন্তানদের সুশিক্ষা দেয়ার সকল বন্ধুর পথকে অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাই, ছিন্ন করি কুসংস্কার আর অন্ধকারের দেয়াল।
পারবে কি এ দেশের অনাগত মা’রা কিছু শিখতে এ স্বর্ণপ্রভা মায়ের থেকে? উড়তে কি পারবে তার দেখানো সীমাহীন দিগন্তে? পারবে কি বানাতে ক্রান্তিকালকে জলে ভাসা পদ্ম? ছুঁতে কি পারবে আকাশ নীলিমায় ম্রিয়মান আলোকচ্ছটাকে?

[লেখাটি মায়ের সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখিত]

দেখা যাক মা বিষয়ে হুমায়ুন আজাদ কি বলেছেন? 
:
আমাদের মাকে আমরা বলতাম তুমি, বাবাকে আপনি।
আমাদের মা গরিব প্রজার মত দাঁড়াতো বাবার সামনে,
কথা বলতে গিয়ে কখনোই কথা শেষ ক’রে উঠতে পারতোনা।
আমাদের মাকে বাবার সামনে এমন তুচ্ছ দেখাতো যে
মাকে আপনি বলার কথা আমাদের কোনোদিন মনেই হয়নি।


আমাদের মা আমাদের থেকে বড় ছিলো, কিন্তু ছিলো আমাদের সমান।
আমাদের মা ছিলো আমাদের শ্রেনীর, আমাদের বর্ণের, আমাদের গোত্রের।
বাবা ছিলেন অনেকটা আল্লার মতো, তার জ্যোতি দেখলে আমরা সেজদা দিতাম
বাবা ছিলেন অনেকটা সিংহের মতো, তার গর্জনে আমরা কাঁপতে থাকতাম
বাবা ছিলেন অনেকটা আড়িয়াল বিলের প্রচন্ড চিলের মতো, তার ছায়া দেখলেই
মুরগির বাচ্চার মতো আমরা মায়ের ডানার নিচে লুকিয়ে পড়তাম।
ছায়া সরে গেলে আবার বের হয়ে আকাশ দেখতাম।


আমাদের মা ছিলো অশ্রুবিন্দু-দিনরাত টলমল করতো
আমাদের মা ছিলো বনফুলের পাপড়ি;-সারাদিন ঝরে ঝরে পড়তো,
আমাদের মা ছিলো ধানখেত-সোনা হয়ে দিকে দিকে বিছিয়ে থাকতো।
আমাদের মা ছিলো দুধভাত-তিন বেলা আমাদের পাতে ঘন হয়ে থাকতো।
আমাদের মা ছিলো ছোট্ট পুকুর-আমরা তাতে দিনরাত সাঁতার কাটতাম।
আমাদের মার কোনো ব্যক্তিগত জীবন ছিলো কিনা আমরা জানি না।
আমাদের মাকে আমি কখনো বাবার বাহুতে দেখি নি।


আমি জানি না মাকে জড়িয়ে ধরে বাবা কখনো চুমু খেয়েছেন কি না
চুমু খেলে মার ঠোঁট ওরকম শুকনো থাকতো না।
আমরা ছোট ছিলাম, কিন্তু বছর বছর আমরা বড় হতে থাকি,
আমাদের মা বড় ছিলো, কিন্তু বছর বছর মা ছোটো হতে থাকে।
ষষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ার সময়ও আমি ভয় পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতাম।
সপ্তম শ্রেনীতে ওঠার পর ভয় পেয়ে মা একদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে।
আমাদের মা দিন দিন ছোটো হতে থাকে
আমাদের মা দিন দিন ভয় পেতে থাকে।


আমাদের মা আর বনফুলের পাপড়ি নয়, সারাদিন ঝরে ঝরে পড়েনা
আমাদের মা আর ধানখেত নয়, সোনা হয়ে বিছিয়ে থাকে না
আমাদের মা আর দুধভাত নয়, আমরা আর দুধভাত পছন্দ করিনা
আমাদের মা আর ছোট্ট পুকুর নয়, পুকুরে সাঁতার কাটতে আমরা কবে ভুলে গেছি।
কিন্তু আমাদের মা আজো অশ্রুবিন্দু, গ্রাম থেকে নগর পর্যন্ত
আমাদের মা আজো টলমল করে।



লেখাটি ফেসবুকে দেখতে চাইলে নিচের লিংকে যান প্লিজ


শরৎচন্দ্রের মহেশ (গফুর আর আমিনার গল্প) গল্পের শেষ পর্ব : গল্প # ৫২


আমার লেখা মহেশ (গফুর আর আমিনার গল্প) গল্পের শেষ পর্ব
:
শরৎচন্দ্রের মহেশ (গফুর আর আমিনার গল্প অবলম্বনে রচিত)
:
মূল গল্পের শেষাংশ : 

অনেক রাত্রে গফুর মেয়েকে তুলিয়া কহিল, আমিনা, চল্‌ আমরা যাই—
সে দাওয়ায় ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল, চোখ মুছিয়া উঠিয়া বসিয়া কহিল, কোথায় বাবা?
গফুর কহিল, ফুলবেড়ের চটকলে কাজ করতে।

মেয়ে আশ্চর্য হইয়া চাহিয়া রহিল। ইতিপূর্বে অনেক দুঃখেও পিতা তাহার কলে কাজ করিতে রাজী হয় নাই,—সেখানে ধর্ম থাকে না, মেয়েদের ইজ্জত-আব্রু থাকে না, এ কথা সে বহুবার শুনিয়াছে।

গফুর কহিল, দেরি করিস নে মা, চল্‌, অনেক পথ হাঁটতে হবে।

আমিনা জল খাইবার ঘটি ও পিতার ভাত খাইবার পিতলের থালাটি সঙ্গে লইতেছিল, গফুর নিষেধ করিল, ও-সব থাক্‌ মা, ওতে আমার মহেশের প্রাচিত্তির হবে।

অন্ধকার গভীর নিশীথে সে মেয়ের হাত ধরিয়া বাহির হইল। এ গ্রামে আত্মীয় কেহ তাহার ছিল না, কাহাকেও বলিবার কিছু নাই। আঙ্গিনা পার হইয়া পথের ধারে সেই বাবলাতলায় আসিয়া সে থমকিয়া দাঁড়াইয়া সহসা হুহু করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। নক্ষত্রখচিত কালো আকাশে মুখ তুলিয়া বলিল, আল্লা ! আমাকে যত খুশি সাজা দিয়ো, কিন্তু মহেশ আমার তেষ্টা নিয়ে মরেচে। তার চ’রে খাবার এতটুকু জমি কেউ রাখেনি। যে তোমার দেওয়া মাঠের ঘাস, তোমার দেওয়া তেষ্টার জল তাকে খেতে দেয়নি, তার কসুর তুমি যেন কখনো মাপ ক’রো না।

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------

কোলকাতার ইস্টার্ন বাইপাসের রাস্তায় অনেক মানুষের জটলা দেখে থমকে দাঁড়ালাম। এক বুড়ো মরে পরে আছে পিয়ারলেস হাসপাতালের সামনের ফুটপাথে, আর তার ২০/২২ বছরের মেয়ের কান্নায় ক্লেদাক্ত হচ্ছে পথচারির হৃদয়। মেয়েটি তার মৃত বাবার জন্য ভগবানের কাছে আকুতি না জানিয়ে, আল্লাহর নামে কান্নাকাটি করাতে অনেক উচুঁ ও মাঝারি জাতের হিন্দুরা “ইজ্জত” বাঁচিয়ে কেটে পড়লো ওখান থেকে। আমি একজন বিদেশি ছাড়াও কোলকাতার অভাগি ২ নারীও দেখছিলাম মেয়েটির কান্না। বিলাপের ভাষা পূর্ববঙ্গীয় তথা ‘বঙাল’ ভাষা হওয়াতে ২/১-জন পথচারী মেয়েটিকে জেরা শুরু কর‍লো যে, সে বাংলাদেশি অবৈধ মুসলিম কিনা? অতি উৎসাহি কেউ কেউ পুলিশে খবর দিতে বললো।
:
এক পর্যায়ে জানলাম মেয়েটির নাম আমিনা। বুকের মাঝে কেমন যেন ছ্যাৎ করে উঠলো আমার। বললাম, তোমার মৃত বাবার নাম কি? বললো, গফুর মিয়া? আরে বলো কি? তুমিই কি সেই আমিনা আর গফুর। যাকে নিয়ে শরৎচন্দ্র তার মহেষ গল্পটি লিখেছিল?
:
শোকার্ততার মাঝেও হ্যা সূচক মাথা নাড়লো আমিনা। জানতে চাইলাম, তুমি এখানে কেন এলে? তোমরা তো বাংলাদেশের কাশিপুর গ্রামে ছিলে। ফুলবেড়ের চটকলে কাজ করতে যাওয়ার কথা ছিল তোমার বাবার। তো কোলকাতা এলে কিভাবে?
:
বুকভাঙা শোক বুকে চেপে ক্লেদাক্ত মেয়িটি যা বললো তার মর্মার্থ হচ্ছে, তারা বাংলাদেশেই ছিল। কাশিপুর গাঁ থেকে রাতের অন্ধকারে ফুলবেড়ের চটকলে কাজ করতে গিয়েছিল তারা। কিন্তু গফুর বয়স্ক আর অসুস্থ্য থাকাতে ৩-দিনের বেশি কাজ করতে পারেনি সেখানে। 
:
তারপর অনেক কষ্ট আর সংগ্রামের সাগর পাড়ি দিয়ে এক সময় ঢাকা পৌঁছে তারা। গফুর ছোটখাটো কাজ করে সংসার চালানোর চেষ্টা করে। বিএনপি বস্তিতে অনেকদিন থাকার পর, আমিনার বাড়ন্ত শরীরের দিকে চোখ পড়ে বস্তির লোকজনের। একসময় দালালেরা সীমান্তের ওপারে মানে কোলকাতায় সুন্দর জীবনের কথা বলে আমিনা আর গফুরকে পার করায় দুর্গম কাটাতারের বর্ডার। গফুরকে অন্যঘরে আটকে রেখে ১৫/১৬ বছরের আমিনাকে দালাল চক্র ধর্ষণ করে ক্রমাগত এপার আর ওপার বাংলায়। এক সময় ওদের থেকে ছাড়া পেয়ে নানা মানুষ আর স্থান ঘেটে কণ্টকের পথ ঘুরে কোলকাতা পৌঁছুতে তাদের কেটে যায় দু’বছর। বাংলাদেশে যেমন যায়গা মেলেনি হতদরিদ্র হওয়ার কারণে, এখানে সুবিধা হচ্ছেনা মুসলিম হওয়াতে। নাম শুনেই অনেকেই আমিনাকে ঘরে কাজ দিতে বা গফুরকে ক্ষেতে কাজ দিতে অনিহা দেখায়।
:
১ বছর থেকে কোলকাতা রুবি হাসপাতালের কাছে একটা ঝুপড়িতে থাকতো গফুর আমিনা। ২/৩ দিন থেকে গফুর মারাত্মক অসুস্থ্য হলে ভোররাতে পিয়ারলেসে ভর্তির আগেই পথে মারা যায় বাংলাদেশের কাশিপুর গাঁয়ের গফুর জোলা ।
:
স্কুল পাঠ্যে গফুর আমিনা আর মহেষের গল্প পড়ে এক সময় তাদের জন্য খুব মায়া হতো আমার। মনে পড়তো, আহারে ওদের পেলে আমাদের সচ্ছল পরিবারে আজীবন রেখে দিতাম সুখে। আমিনাকে পড়াতাম বাড়ির কাছের কোন স্কুলে। কিশোরি সেই কল্পনার আমিনা এখন পোড় খাওয়া বিধ্বস্ত শরীরের ২২ বছরের দুখী তরুণির প্রতিচ্ছবি, সম্ভবত শিক্ষা বিপণনের এ যুগেও আমিনার ভাগ্যে জোটেনি কোন স্কুল।
:
চিরদুখি এ মেয়েটির এ দুসময়ে কিভাবে তাকে সাহায্য করবো ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কারণ কোলকাতাতে অনেকবার গেলেও, মৃতের শেষ কৃত্যানুষ্ঠান সম্পর্কে ধারণা ছিলনা আমার। পিয়ারলেসের সামনের পরিচিত মন্ডল হাউসের লোকজনের সাহায্যে গফুরকে মুসলিম গোরস্থানে দাফনের ব্যব্স্থা করতে পারি এক অপরিচিত শহরে। গফুর আমিনার কথা শুনে অনেকেই সহযোগিতার কথা বলে। কেউ কেউ আমিনাকে সাথে নিতে চায় পুনর্বাসনের জন্যে। কিন্তু নানা তিক্ত অভিজ্ঞতায় আমিনা মানুষের প্রতি বিশ্বাস এমনভাবে হারিয়েছে যে, কোনভাবেই তাকে আর কারো কাছে দিতে পারলাম না। অবশেষে সিদ্ধান্ত নেই বাংলাদেশে নিয়ে আসবো তাকে।
:
কোলকাতার উপ-দূতাবাসে একদিন হাজির হলাম আমিনাকে নিয়ে। নানাভাবে বোঝানোর পরও আমিনার বাংলাদেশি কোন কাগজপত্র না থাকাতে, কোনভাবেই তার পাসপোর্ট দিতে রাজি হলোনা বাংলাদেশ দূতাবাস। নিজের প্রভাব খাটিয়েও কোন পোসপোর্ট পেলাম না আমিনার। অবশেষে অনেকটা জেদ চাপলো, যে কোনভাবেই হোক আমিনাকে নিয়ে আসবোই বাংলাদেশে। খুঁজে বের করবো তার কাশিপুর গ্রাম।
:
একদিন বাঘা-যতিন স্টেশন থেকে ট্রেনে চাপলাম শিয়ালদা হয়ে বনগাঁ বর্ডারে আসবো, যাতে বেনাপোল দিয়ে ঢুকতে পারি বাংলাদেশে। আমি পাসপোর্ট ভিসাধারি বৈধ বাংলাদেশি নাগরিক। আমিনা বৈধ হয়েও এখন অবৈধ হিসেবে আমার সহযাত্রি।
:
শিয়ালদা থেকে ধাবমান সর্পিল ট্রেনটি যান্ত্রিক হাহাকার তুলে বনগাঁর দিকে এগুতে থাকে দুপুরের পড়ন্ত লালচে রোদ ভেঙেচুড়ে। ভয়ার্ত আমিনার দিকে তাকিয়ে সমাজ আর সংসার কর্তৃক তার হন্তারক পিতার দৃশ্যটি ভেসে উঠে আমার চোখে। এ বিষাদের নৃত্যনাট্য একটা বুকফাটা যন্ত্রণা হয়ে অস্থির করে চলমান ক্ষয়িষ্ণু সময়কে। মনের অন্ত:পুরে জমে থাকা বেদনার জল লিন হয়ে আমার চোখকে আর্দ্র করে গফুর, আমিনা আর মহেষের জন্যে। ইচ্ছে করে ধর্মান্ধ ফতোয়াবাজ তর্করত্ন আর জমিদার শিবচরণ বাবুদের খুঁজে এনে এ বনগাঁ লোকালের নিচে ঠেলে দেই। পিষে মারি ওদের, যাতে ওরা আর উৎখাত করতে না পারে আমিনা আর গফুরদের বাস্তুভিটে থেকে কোনদিন! 
:
হঠাৎ মৃত্যুর মত হিসহিস করতে করতে শব্দহীন ট্রেনটা বনগাঁ জংশনে দাঁড়ায়। খুব কাছেই বাংলাদেশ সীমান্ত পেট্রাপোল-বেনাপোল বর্ডার। আমিনাকে নিয়ে আমি বর্ডারের দিকে এগুতে থাকি স্তব্ধতা স্মৃতি আর আকাঙ্ক্ষার সব গল্পকে পেছনে ফেলে। শীতের ক্ষয়ে যাওয়া দুপুরের ধূসরতা আর বিষন্ন নিরুত্তাপ রোদে নিস্ব ক্ষেতের মাঠ ছেড়ে উর্দি পড়া বিএসএফ-বিজিবির দিকে এগুতে থাকি অবৈধ আমিনার হাত ধরে আমি। কাঁপতে থাকে আমার বুক। পারবো কি এ বৈশ্বিক জটিলতার জাল ছিন্ন করে তার পৈত্রিকভিটা গফুর জোলার কাশিপুর গাঁয়ে নিয়ে যেতে তাকে? যে গাঁয়ে ঘুরে বেড়াছে গফুরের অতৃপ্ত আত্মা অবোধ মহেশের স্মৃতি নিঙড়ে! 
:
শরৎচন্দ্রের মহেষ (গফুর আর আমিনার গল্পের শেষ পর্ব)



লেখাটি ফেসবুকে দেখতে চাইলে নিচের লিংকে যান প্লিজ


মেঘেদের মাঝে অতন্দ্রিলার মা, আমার আর আমাদের মা-দের ভালবাসার গল্প [ কাব্যিক গল্পমালা : ৫১ ]



সরকারি একটা সর্ট প্রশিক্ষণে বৃটেন যাচ্ছিলাম আমিরাত বিমানে। পাশের সিটের ভদ্রমহিলাকে বাঙালি বলে মনে হলো আমার। কিন্তু তিনি নিজে কোন কথা না বলাতে, আগ বাড়িয়ে আমিও আর কথা বললাম না তার সাথে। ঢাকা থেকে দুবাই পর্যন্ত যে যার সিটে বসে টিভি স্কিন দেখতে থাকলাম দু'জনে। ঘটনাক্রমে দু'জনেই বৃটেন যাত্রী হওয়াতে দুবাই বিমানবন্দরে ৬ ঘন্টার ট্রানজিটে অসহনীয় সময় কাটাতে দুজনে ট্রানজিট লাউঞ্জে পরিচিত হলাম নিজেদের গরজেই। চল্লিষোর্ধ নারী পরিচয় দিলেন ভার্জিনিয়া থাকেন তিনি, বাংলাদেশে বাড়ি কিন্তু এখন ওখানের সিটিজেন। ১ সন্তানের মা তিনি, স্পাউস থাকেন সাথে তার । সন্তান বড় হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। শুনে খুশী লাগলো আমার মনে মনে বললাম, একজন সুখী নারী হবেন তিনি অবশ্যই। 
:
বিমর্ষ করুণতায় হাসলেন অতন্দ্রিলা নামের মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের এ মেয়েটি। আমার বাবাও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এ তথ্যে অল্প সময়েই বন্ধুত্ব হয়ে গেল অতন্দ্রিলার সাথে। হাসিমুখে খুব কাছে এসে বসলো অতন্দ্রিলা। বাবা মার কথা জানতে চাইলে হঠাৎ ক্লেদাক্ত হলো অতন্দ্রিলার চোখমুখ। কথার মাঝে বাকরুদ্ধ হলো তার। আমি কিছুটা বিস্মিত হয়ে থামালাম তাকে। হাসির জোক বলে হালকা করার চেষ্টা করলাম পরিবেশ কিন্তু অতন্দ্রিলার ব্যথাতুর করুণ কণ্ঠ আর উঠলো না। আমি বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলাম তার এ করুণতার কথা। অতন্দ্রিলার জীবনের যে গল্প আমায় বলে গেল প্রায় ৫-ঘন্টা দুবাই এয়ারপোর্টে তা যেমন গৌরবের তেমনি করুণকায় স্নাত!
:
মানিকগঞ্জের সুবর্ণ গাঁয়ে ছিল তাদের বাড়ি। ৪-ভাইবোনের সংসার তাদের। বাবা চাকুরি করতেন আর মা ছিলেন গৃহিনী। ২-ভাই চলে গেছে মুুক্তিযুদ্ধে তখন। অতন্দ্রিলার বয়স তখন ৫ বছর মাত্র। ১১ জুন ৭১ রাজাকারদের সহযোগিতায় পাক সেনারা আক্রমন করলো এদের বাড়ি। মা ছিলেন পুকুর ঘাটে। টের পেয়ে ২ মেয়ে + অন্য এক আত্মীয়ের মেয়েসহ আশ্রয় নিলেন পাশের বেতঝোপের মাঝে। কিন্তু মানুষের নড়াচড়া দেখে ব্রাশ ফায়ার করলো রাজাকার আর পাক আর্মিরা। যুদ্ধে বিমুখ মার বুকে লাগলো গুলি। ঝোপের মাঝেই লুটিয়ে পড়লো মা। অবোধ্য ৫ বছরের অতন্দ্রিলা চেষ্টা করলো মার বুকের গুলি অপসারণের। কম বয়সি মেয়েদের পাশে কাতরানো গুলিবিদ্ধ মাকে দেখে হায়েনারা চলে গেল। ছোট ৩ অবোধ মেয়ে মায়ের মুখে দিল শেষ বিদায়ের পানি। প্রাণভয়ে পালালো তারা মাকে ওভাবে ফেলেই।
:
হায়েনারা চলে গেলে সাহসি পরশিরা ঝোপ থেকে নিয়ে এলো মার লাশ। রাতে অবোধ দুবোন মৃত মাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লো তার পাশেই। তারপর ন'মাস ছুৃটে চলার এক অনন্ত কাহিনি, বেঁচে থাকার অদম্য তাড়নায় অতন্দ্রিলা, তার বোন আর বাবা পদ্মাার এপার থেকে ওপার পর্যন্ত ছুটে চলেছেন নিরন্তর, যুদ্ধশেষে ভাইরা ফিরেছেন পোড়ো ভিটায় মা শূন্য ঘরে। এটুকু বলার পর আর কথা বলতে পারলো না অতন্দ্রিলা নামের টেক্সাসি বাঙালি নারী। 
:
একাত্তরে অতন্দ্রিলার মার মৃত্যুদৃশ্য জগতের সকল সুন্দরের ধারণা বাদ দিয়ে, মনের অন্ত:পুরে বিষাদের সুর বাজাতে থাকে আমার। তখন বিশ্বের ঝকমকে রঙিন সাজে সজ্জিত দুবাই বিমানবন্দরকে এক ধুলোময় গোলকের জালে আতঙ্কের আঁচল রূপে দেখি আমি। ঘোষক বার বার আরবি আর ইংরেজিতে ডাকতে থাকে লন্ডন ফ্লাইটের শেষ যাত্রী হিসেবে আমাদের দু'জনের নাম কিন্তু অতন্দ্রিলার কান্নার রিণরিণে শব্দ তখনো থামেনা। ঘোষণার শব্দমালারা মনের অন্তর্বাস ছুঁয়ে হৃদয় গহীনে আঘাত করতে থাকে অনবরত। অতন্দ্রিলা আর আমার মননে তখন এক বিষাদের নৃত্যনাট্য ঝরে পড়ে ক্রমাগত। আমি অতন্দ্রিলার হাত ধরে তাকে নিয়ে বোর্ডিং ব্রিজের দিকে এগুতে চাই। বেদনাই যেন একমাত্র নৈ:শব্দ সাথি হয়ে অতন্দ্রিলাকে আঁকড়ে ধরে। এতো বছর পরও জীবনের নিরর্থকতা প্রেমহীনতায় পরিণত হয় অতন্দ্রিলার কাছে। 
:
এক সময় শেষ যাত্রী হিসেবে অতন্দ্রিলা আর আমি বিমানে পাশাপাশি বসি। প্রপেলারের প্রচণ্ড তীব্র ঘুর্ণনে সব শোকগাঁথা গচ্ছিত রেখে অতন্দ্রিলাকে সান্ত্বনা দেয়ার মিথ্যে চেষ্টা করি আমি বিদগ্ধ জনের মত। বিমান আকাশে উড়তে থাকে ক্রমাগত, নীচে ভাসমান সাদা আর গোলাপী মেঘের মাঝে আমি সুষ্পষ্ট দেখতে পাই অতন্দ্রিলার মাকে। যিনি ককপিটের ফোঁকর দিয়ে দেখতে চা্ইছেন তার মেয়েকে, যে মৃত্যুর সময় তার মুখে দিয়েছিল প্রশান্তির পানি। যতক্ষণ পর্যন্ত হিথরোতে বিমান না নামলো, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি মেঘমালা থেকে চোখ সরালাম না, যে মেঘের মাঝে সাঁতরে বেড়াচ্ছে অতন্দ্রিলার মা, আমার মা, আরো কতো সন্তানের মা'রা। যারা তাদের সন্তানদের আকাশে খুঁজে ফিরছে অহরহ, তারা উড়ন্ত বিমান দেখলেই মেঘের মাঝ থেকে উড়তে উড়তে খুঁজতে থাকে তাদের সন্তানদের, যেন আশির্বাদ দিতে পারে মৃতপরবর্তী এক অবোধ্য জীবন থেকে, কেবল সুসন্তানের জন্যে! কিন্তু সব সন্তানরা কি এমন মা'দের কাছে যেতে পারে? 
:
সাদা গোলাপি সপ্তবর্ণা মেঘের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আমি মৃত হুমায়ুন আজাদকে দেখতে পাই সুষ্পষ্টরূপে, যিনি মেঘের ভেলায় ভেসে বেড়ানো মাদের শোনাচ্ছেন তাঁর "আমাদের মা" কবিতাটি, যার রেশ এখনো বিমানে উঠলেই আমি শুনি-
:
"আমাদের মাকে আমরা বলতাম তুমি, বাবাকে আপনি।
আমাদের মা গরিব প্রজার মত দাঁড়াতো বাবার সামনে,
কথা বলতে গিয়ে কখনোই কথা শেষ ক’রে উঠতে পারতোনা।
আমাদের মাকে বাবার সামনে এমন তুচ্ছ দেখাতো যে
মাকে আপনি বলার কথা আমাদের কোনোদিন মনেই হয়নি।
আমাদের মা আমাদের থেকে বড় ছিলো, কিন্তু ছিলো আমাদের সমান।
আমাদের মা ছিলো আমাদের শ্রেনীর, আমাদের বর্ণের, আমাদের গোত্রের।
বাবা ছিলেন অনেকটা আল্লার মতো, তার জ্যোতি দেখলে আমরা সেজদা দিতাম
বাবা ছিলেন অনেকটা সিংহের মতো, তার গর্জনে আমরা কাঁপতে থাকতাম
বাবা ছিলেন অনেকটা আড়িয়াল বিলের প্রচন্ড চিলের মতো, তার ছায়া দেখলেই
মুরগির বাচ্চার মতো আমরা মায়ের ডানার নিচে লুকিয়ে পড়তাম।

ছায়া সরে গেলে আবার বের হয়ে আকাশ দেখতাম।
আমাদের মা ছিলো অশ্রুবিন্দু-দিনরাত টলমল করতো
আমাদের মা ছিলো বনফুলের পাপড়ি;-সারাদিন ঝরে ঝরে পড়তো,
আমাদের মা ছিলো ধানখেত-সোনা হয়ে দিকে দিকে বিছিয়ে থাকতো।
আমাদের মা ছিলো দুধভাত-তিন বেলা আমাদের পাতে ঘন হয়ে থাকতো।
আমাদের মা ছিলো ছোট্ট পুকুর-আমরা তাতে দিনরাত সাঁতার কাটতাম।
আমাদের মার কোনো ব্যক্তিগত জীবন ছিলো কিনা আমরা জানি না।
আমাদের মাকে আমি কখনো বাবার বাহুতে দেখি নি।

আমি জানি না মাকে জড়িয়ে ধরে বাবা কখনো চুমু খেয়েছেন কি না
চুমু খেলে মার ঠোঁট ওরকম শুকনো থাকতো না।
আমরা ছোট ছিলাম, কিন্তু বছর বছর আমরা বড় হতে থাকি,
আমাদের মা বড় ছিলো, কিন্তু বছর বছর মা ছোটো হতে থাকে।
ষষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ার সময়ও আমি ভয় পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতাম।
সপ্তম শ্রেনীতে ওঠার পর ভয় পেয়ে মা একদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে।
আমাদের মা দিন দিন ছোটো হতে থাকে
আমাদের মা দিন দিন ভয় পেতে থাকে।

আমাদের মা আর বনফুলের পাপড়ি নয়, সারাদিন ঝরে ঝরে পড়েনা
আমাদের মা আর ধানখেত নয়, সোনা হয়ে বিছিয়ে থাকে না
আমাদের মা আর দুধভাত নয়, আমরা আর দুধভাত পছন্দ করিনা
আমাদের মা আর ছোট্ট পুকুর নয়, পুকুরে সাঁতার কাটতে আমরা কবে ভুলে গেছি।
কিন্তু আমাদের মা আজো অশ্রুবিন্দু, গ্রাম থেকে নগর পর্যন্ত
আমাদের মা আজো টলমল করে"।

[লেখাটি অতন্দ্রিলার মাসহ পৃথিবীর সকল মায়েদের জন্যে উৎসর্গকৃত]



লেখাটি ফেসবুকে দেখতে চাইলে নিচের লিংকে যান প্লিজ



হাওড়া বোম্বে মেলের ওম আর তার মা-হারা মেয়ের কান্না কাহিনি [ গল্প # ৫০ ]



মুম্বাই থেকে কোলকাতা 'জ্ঞানেস্বরি এক্সপ্রেস' ট্রেনে প্রায় ৩৭ ঘন্টার ট্রেন জার্নি। তাপানুকুল কামড়াতে টিকেট করেও কেবল জানালা খুলে চলমান পথ নদী মানুষ আর আকাশকে দেখার লোভে নিজ সিট ফেলে মাঝবয়েসি এক বিহারের লোকের পাশে বসি। হিন্দিতে গল্প করি তার সাথে অনেক গল্প। বাংলাদেশে আটকে পরা বিহারের হিন্দিভাষি মানুষদের কথা বলি তাকে। এক সময় তার পরিচয় দেয় সে, গরিব রাজপুত 'ওম' নাম তার। মা মরা ২-মেয়েকে নিয়ে থাকে কোলকাতা থেকে ২০কিমি দূরত্বে রিষড়াতে। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে ৩-মাস আগে মুম্বাইতে এক রাজপুত ছেলের কাছে। ছোট মেয়ের বয়স ১০/১১, তাকে নিয়েই থাকে সে কোলকাতার অদুরে এখন, কাজ করে একটা টেক্সটাইল মিলে।

যাওয়ার আগে বোনকে দেখতে যেতে চেয়েছিল বাবার সাথে ছোট মেয়ে রত্নাও। কিন্তু আসা-যাওয়ায় প্রায় ১৫০০ টাকার ট্রেনভাড়ার কারণে মেয়ে ছাড়াই একা গেল 'ওম' বোম্বেতে। ছোট মেয়েকে অনেক বুঝিয়ে পাশের বাসায় রেখে গেছে ৩-দিনের জন্যে। এখন আবার তার একমাত্র কাজ চাকুরি করে ৩/৪ লাখ টাকা সঞ্চয় করা, যা দিয়ে রাজপুত রীতি অনুসারে ছোট মেয়েকে বিয়ে দিতে পারে সে। প্রেম বা অন্য বর্ণে বিয়ে স্বীকৃত নয় রাজপুত রীতিতে। বড় মেয়েকে বিয়ে দিতে ৪-লাখ খরচ হয়েছে তার, ধার করেছে ১ লাখ।

এমন পিতার বর্ণনায় আপ্লুত হই আমি। মেয়ে রত্নার জন্যে সাথে থাকা বিস্কুট, আপেল আর পিয়ারস দিয়ে দেই ক'টা। আপত্তি করেও রাজপুত বাবা সম্ভবত 'মেয়ের টানে' আমার উপহার গ্রহণ করে। এক ফেসবুক বন্ধু থাকে রিষড়ায়। তাকে ফোন দেই ট্রেন থেকেই। পরদিন প্রোগ্রাম করি দুপুরে দেখা করবো তার সাথে। কোলকাতা অনেক জরুরি কাজ থাকার পরও হাওড়া থেকে ট্রেন ধরে পরদিন যাই রিষড়ায়। ফোন দেই ওমকে, এক সময় কিছু ফল,চকলেট, চিপস কিনে হাজির হই ওমের টালির ভাড়াটে ঘরে। বাবা মেয়ের ছোট্ট সংসার আর মেয়েটার শুকনো ম্লান মুখ দেখে চোখে জল আসে আমার! 

পৃথিবীর সর্বত্র বহতা নদীর মত এই যে জীবন, এ জীবনবোধেই আমাদের বৈশ্বিক মানবিক রূপ দান করে। এখানে ধর্ম বর্ণের উর্ধে মানুষরূপে আমাদের সামনে চলে আসে "মানুষ আর তার মানবিকতা"। কোলকাতা ফিরে আসার জন্যে বর্ধমান লোকালে উঠে পড়ি রিষড়া থেকে, কিন্তু চলমান ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দ আর হৃদ কাঁপানো প্রচন্ড হুইসেলেও আমি ওম আর তার মা মরা মেয়ের ট্রাজিক মুখ দেখতে থাকি ষ্পষ্ট অনেকক্ষণ। হাওড়া স্টেশনে পৌঁছার আগ পর্যন্ত আমার মননে এ কবিতা বাজতেই থাকে ----

"আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম,
হাঁটতে পারে, বসতে পারে, এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যায়,
মানুষগুলো অন্যরকম, সাপে কাটলে দৌড়ে পালায় ।

আমি হয়তো মানুষ নই, সারাটা দিন দাঁড়িয়ে থাকি,
গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকি।
সাপে কাটলে টের পাই না, সিনেমা দেখে গান গাই না,
অনেকদিন বরফমাখা জল খাই না ।
কী করে তাও বেঁচে থাকছি, ছবি আঁকছি,
সকালবেলা, দুপুরবেলা অবাক করে
সারাটা দিন বেঁচেই আছি আমার মতে । অবাক লাগে ।

আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষ হলে জুতো থাকতো,
বাড়ি থাকতো, ঘর থাকতো,
রাত্রিবেলায় ঘরের মধ্যে নারী থাকতো,
পেটের পটে আমার কালো শিশু আঁকতো ।

আমি হয়তো মানুষ নই,
মানুষ হলে আকাশ দেখে হাসবো কেন ?
মানুষগুলো অন্যরকম, হাত থাকবে,
নাক থাকবে, তোমার মতো চোখ থাকবে,
নিকেলমাখা কী সুন্দর চোখ থাকবে
ভালোবাসার কথা দিলেই কথা রাখবে ।

মানুষ হলে উরুর মধ্যে দাগ থাকতো ,
বাবা থাকতো, বোন থাকতো,
ভালোবাসার লোক থাকতো,
হঠাৎ করে মরে যাবার ভয় থাকতো ।

আমি হয়তো মানুষ নই,
মানুষ হলে তোমাকে নিয়ে কবিতা লেখা
আর হতো না, তোমাকে ছাড়া সারাটা রাত
বেঁচে থাকাটা আর হতো না ।

মানুষগুলো সাপে কাটলে দৌড়ে পালায়;
অথচ আমি সাপ দেখলে এগিয়ে যাই,
অবহেলায় মানুষ ভেবে জাপটে ধরি" ।




লেখাটি ফেসবুকে দেখতে চাইলে নিচের লিংকে যান প্লিজ



নদী নির্ভর মানুষের দুখে ভরা জীবন দহন ! পর্ব : ২ [কাব্যিক গল্পমালা সিরিজ] গল্প # ৪৯

48টির 1 - 25 

বাংলাদেশে, সাধারণত বর্ষাকালে উজানে প্রচুর বৃষ্টিপাতের দরুন নদীর পানি বেড়ে যায় এবং তা প্রচন্ড গতিতে সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়। এসময় উপকূলীয় অঞ্চলের নদীসংলগ্ন স্থলভাগে পানির তীব্র তোড়ে সৃষ্টি হয় নদীভাঙনের। বাংলাদেশে এটা স্বাভাবিক চিত্র হলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় তা আর স্বাভাবিক বলে পরিগণিত হচ্ছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেয়া তথ্যমতে, পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার জুড়ে ভাঙন অব্যাহত আছে। আরও প্রায় ৫০০ কিলোমিটার এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিতে পারে। এতে কৃষি জমির এক বিরাট অংশ নদীগর্ভে তলিয়ে যাবে। অথচ এর বিপরীতে যে চর জেগে উঠছে, তা অপ্রতুল।

বাংলাদেশের পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (CEGIS) উপগ্রহের মাধ্যমে সংগৃহীত উপাত্ত বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে যে, ১৯৭৩-২০০৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভোলার মূল ভূভাগ থেকে ২৪০ বর্গ কিলোমিটার জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। উপগ্রহচিত্রে দেখা যায় ভোলার উত্তর-পূর্ব দিকে ভাঙনের প্রবণতা বেশি। যদিও একই সময়ে ৭০ বর্গ কিলোমিটার নতুন চর ভোলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, কিন্তু ভাঙনের তুলনায় তা যৎসামান্য। পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানা যায়, ২০০৪-২০০৮ -এই চার বছর ভাঙনের মাত্রা বেড়েছে, আর ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে তা সর্বোচ্চ হয়েছিল।

কোপেনহেগেনে জলবায়ু বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে (২০০৯) বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনগুলির একটিতে জানানো হয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার জুড়ে ভাঙন অব্যাহত আছে। এবং আরও প্রায় ৫০০ কিলোমিটার জুড়ে নতুন করে ভাঙন দেখা দিতে পারে।
ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নেরর একটি অংশের নাম ঘর রাজাপুর, অন্য অংশটির নাম বাহির রাজাপুর। বাহির রাজাপুরে ৬ বছর আগেও ১৭টি গ্রাম ছিলো; ভাঙনের ফলে তা এসে ঠেকেছে মাত্র ৬টিতে। পাশাপাশি ২০০৯ সালে ভাঙন কবলিত ছিলো সীতারাম এবং উত্তর রামদাসপুর। মনপুরা উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে বিগত ১৫ বছরের তুলনায় ২০০৯ সালের ভাঙনের হার বেশি।

২০০৯ খ্রিস্টাব্দের প্রেক্ষাপটে হাতিয়ার উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাংশের তমরদ্দি, চরকিং ও চরঈশ্বর ইউনিয়ন এবং সুখচর ও নলচিরার অবশিষ্টাংশ ব্যাপক ভাঙনের কবলে রয়েছে। নদীভাঙনের পর হাতিয়া উপজেলা পরিষদ ১৯৮৫-৮৬ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান উপজেলা সদর ওছখালিতে স্থানান্তর করা হয়েছিলো। ভাঙনের কবলে ইতোমধ্যেই রাজকুমার সাহার হাট, মনু বেপারির হাট, হিজিমিজির বাজার, নায়েবের হাট, সাহেবের হাট, নলচিরা বাজার, সাহেবানী বাজার, চৌরঙ্গী বাজার, জাইল্লা বাজার, মফিজিয়া বাজার, নলচিরা নতুন বাজার ও ভুঞার হাট মেঘনাগর্ভে হারিয়ে গেছে। হাতিয়া উপজেলা সরকারি কমিশনার (ভূমি) অফিসসূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ভাঙনের কবলে উপজেলার সাগরদি, চরবাটা, মাইজচরা, চর হাসান-হোসেন, চরকিং, উত্তর চরকিং, কাউনিয়া, চরবগুলা, চরআমানুল্লাহ, দক্ষিণ চরআমানুল্লাহ মৌজাগুলো মেঘনাগর্ভে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া আরো ২০টি মৌজার বেশিরভাগই নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে।

হাতিয়া যে হারে ভাঙছে, সে হারে নতুন জমি হাতিয়ার সাথে যুক্ত হচ্ছে না। সিইজিআইএস-এর উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষিত মত হলো ১৯৭৩-২০০৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত হাতিয়ার মূল ভূভাগ থেকে ১৫০ বর্গ কিলোমিটার জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। দেখা যায়, হাতিয়ার চারদিকই ভাঙছে, তবে প্রবণতা বেশি উত্তরদিকে। পলি জমে দক্ষিণ-পশ্চিমে সাত বর্গকিলোমিটার জমি যুক্ত হলেও ভাঙনের তুলনায় তা যৎসামান্য।

নিঝুম দ্বীপে সরকারি উদ্যোগে গড়ে তোলা বন ধ্বংসের পথে। নদীভাঙন ছাড়াও ঘূর্ণিঝড় আইলায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এই কৃত্রিম উপকূলীয় বনটি। দিনে দিনে বনটি ছোট হয়ে আসছে। এই বন বিলুপ্ত হলে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্দ বঙ্গোপসাগরের আগ্রাসনে টিকতে পারবে না দ্বীপের ২২,০০০-এরও বেশি মানুষ, আর ২০,০০০-এর মতো হরিণ। [তথ্যসূত্র : নেটসহ নানাবিধ সূত্র]

কিন্তু আমার এলাকাসহ অনেক এলাকার মানুষই নদী ভাঙনের কার্যকরী পদক্ষেপের বদলে, নানা অলৌকিক শক্তির কাছে নিজেদের সমর্পন করে, যে কারণে ভাঙন বাড়তেই থাকে। গত বছর বর্ষার দিনে গ্রামে গেলে এমন কয়েকশ' ভাঙন কবলিত পরিবারকে রাস্তায় ঘর তুলে সাময়িক আশ্রয় নিতে দেখি। প্রচন্ড বর্ষায় তাদের ঘরেও পানি ঢুকলে তাদের কষ্টের সীমা থাকে না। অপ্রধান তুচ্ছ এলাকা বিধায় পানি উন্নয়ন বোর্ড বা সরকারের নজর এমন "কেতুপুরের দিকে" কখনো পড়েনি। তাই নিজে কিছু অর্থ নিয়ে তাদের সাহায্যের জন্যে ট্রলার নিয়ে ঘরে ঘরে গিয়ে কিছু খাবার আর রুটি দেয়া শুরু করলে, অভাবী জেলে পরিবারে তা অল্পতেই শেষ হয়ে যায়। এ সমস্যার কোন স্থায়ী সমাধান কখনো হবে কিনা জানিনা আমি। তাই নিজ এলাকার এমন অনাত্মীয় স্বজনদের জন্য মনটা কেঁদে মরে আমার। আরো বেশি কাঁদে যখন বিদেশে মানুষের সুখকর জীবন দেখি, তখন সত্যি আমার নিজ গ্রাম "কেতুপুরের" দৃশ্যে নিজে নিজে রক্তাক্ত হই আমি। ধনকুবের বিল গেটসের কাছে সব জানিয়ে একটা মেল করেছিলাম আমি গত বছর, জবাবো দিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু জানিনা কখনো Bill & Melinda Gates Foundation-র নজর পড়বে কিনা জলযুদ্ধে বিধ্বস্ত জলনির্ভর এ মানুষগুলোর প্রতি। যারা জন্ম থেকে জলের সাথে যুদ্ধ করেও টিকে থাকে কিংবা কেউ কেউ টিকতে না পেরে হোসেন মিয়ার নৌকায় পাড়ি দেয় স্বপ্নের ময়নাদ্বীপে, যেখানেও তাদের জন্য অপেক্ষা করছে হরেক ররক জলদানব আর জলরাক্ষসেরা !


লেখাটি ফেসবুকে দেখতে চাইলে নিচের লিংকে যান প্লিজ




নদী নির্ভর মানুষের দুখে ভরা জীবন দহন ! পর্ব : ১ [কাব্যিক গল্পমালা সিরিজ] গল্প # ৪৮


আমার জন্ম হয়েছিল একটি যোগাযোাগ বিচ্ছিন্ন জেলে প্রধান দ্বীপে। আমার মনে হতো আমার গ্রামটিই মানিক বন্দো্পাধ্যায়ের "কেতুপুর" গ্রাম, যেখানে ঈম্বরকে খুঁজে পাওয়া যায়না, তবুও সবাই ইশ্বরনির্ভর। ভাগ্যনির্ভর মানুষ সব কিছুর জন্য অলৌকিকতাকে দায়ী করতেন (এখনো করে), এমনকি নদী ভাঙন তাদের পাপের ফল এ কথাও ব্যাপকভাবে প্রচার করতেন এলাকার পীরসাহেব ও ধর্মীয় নেতারা, ধর্মান্ধ মানুষ তা বিশ্বাসও করতো মনেপ্রাণে। কতবার আমার দ্বীপে নদী ভাঙন রোধে নদীতে তাবিজ ফেলা হয়েছিল, নদীর তীরে গণমুনাজাতের আয়োজন করা হয়েছিল, মৌলানার নেতৃত্বে রুটিতে আয়াত লিখে হাজারো রুটি নদীতে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তার ইয়াত্তা নেই। তারপরো নদীর ভাঙন থামেনি, কারণ নদীর ভাঙন সম্পর্কে যৌক্তিক কথা হচ্ছে নিম্নরূপ, যা তারা জানে না।


নদীভাঙন, এক প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ। নদীর সমুদ্রে গিয়ে পড়ার সময় সাধারণত সমুদ্রের কাছাকাছি হলে তীব্র গতিপ্রাপ্ত হয়। তখন পানির তীব্র তোড়ে নদীর পাড় ভাঙতে থাকে। নদীর পানির স্রোতে নদীর পাড় ভাঙার এই অবস্থাকে নদীভাঙন বলে।

পানিচক্রের প্রভাবে পর্বতের গায়ে বরফ জমে, সেই বরফ গলা পানি পর্বতের গা থেকে নেমে আসে। এভাবে নদীর সৃষ্টি হয়। নদীর এই পানি সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়। সাধারণত সমুদ্রের কাছাকাছি অংশে নদীর পানি তীব্র গতিতে ছুটে চলে। এছাড়াও বর্ষা মৌসুমে উজানে তীব্র বৃষ্টিপাত হলেও নদীর পানি বেড়ে যায়। তখন নদীতে স্রোতও বেড়ে যায়। নদীর এই তীব্র স্রোত ভাটার দিকে চলার পাশাপাশি নদীর পাড় আঘাত করতে থাকে। পানির এই ক্রমাগত তীব্র আঘাতে নদীতীরবর্তী ভূভাগ ক্ষয় হতে থাকে। একসময় মাটি ক্ষয় হতে হতে যখন উপরের মাটির ভার সহ্য করতে পারে না, তখন উপরের অক্ষয় মাটিসহ নদীপাড়ের বিশাল অংশ বা চাড়া নদীর মধ্যে ভেঙে পড়ে। এসব কারণে ভাঙন এলাকায় নদীর পানি হয় গলিত মাটিপূর্ণ, ঘোলা।

আরো একটি কারণে এমনটা হতে পারে। সাধারণত নদী, তার পানির গতিপথে কোনো বাধা পেলে তাতে তীব্র আঘাত করে। নদী, গতিপথ বদলাবার সময় যেদিকে গতি বদলায়, সেদিকের পাড়ে বারবার তীব্রগতিতে আঘাত করতে থাকে। সাধারণত উপকূল এলাকা পলিগঠিত হওয়ায়, নরম পলিমাটির স্তর সেই আঘাত সহ্য করতে না পেরে ভেঙ্গে পড়ে। এভাবে নদী একদিকের পাড় ভাঙতে থাকলেও অপর দিক থেকে গতি বদলে নেয় বলে অপর দিকে গলিত পলিমাটি নিয়ে জমা করতে থাকে। তাই নদীভাঙনের মাধ্যমে নদীর একপাড় ভাঙে, আরেক পাড় গড়ে।


লেখাটি ফেসবুকে দেখতে চাইলে নিচের লিংকে যান প্লিজ




বৈশ্বিক আমি, মহাজাগতিক আমি ! [কাব্যিক গল্পমালা সিরিজ] গল্প # ৪৭


বৈশ্বিক আমি, মহাজাগতিক আমি !
:
পৃথিবীতে যত রকম জার্নি আছে তার মাঝে ট্রেনজার্নি খুবই প্রিয় আমার। তাই বিমান টিকেট ফিরিয়ে দিয়ে আমি প্রায় ২০০০-কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে চড়ে বসি "জ্ঞানেশ্বরি এক্সপ্রেসে" হাওড়া-থেকে মুম্বাই-পর্যন্ত ৩-দিনের বিরামহিন যাত্রা। কত মানুষ, কত পথ, কত সবুজের মাঠ পেড়িয়ে ট্রেন ছুটে চলে বেঙ্গল, উড়িষ্যা, ঝাড়খন্ড, বিহার, ছত্তিসগড়, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্রের নাম জানা না জানা কত সপ্তপদি স্টেশন ফেলে। আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি কৃষিজমিতে মালকোচা মারা বিহারি নারীদের কাজের গতিতে, সারা মুখ তিলক-চন্দনে ল্যাপ্টানো কেরালা তরুণির হিন্দি আর ইংরেজি কথা শুনে হাসি আটকাতে পারিনা আমি।
:
কৃষাণি যখন তার নিজের বাগানের আপেল আর কাজু বেচতে আসে জানালার ফাঁক দিয়ে আধুনিক ট্রেনে আমি বিস্ময়ে মানুষ আর তার সংগ্রামশীলতায় বিমোহিত হই। এক সময় তারাভরা রাতে ছুটে চলা ঝিকঝিক ট্রেনের শব্দ যখন মহারাষ্ট্রের "বইহাটি-খাজুরাহ-অজন্তা-ইলোরা" স্টেশন ফেলে এগুতে থাকে সামনে, তখন ঘুমহীন রাতে জীবনানন্দ আমার পাশে এসেে বসে তার কবিতা নিয়ে।- সে নিজেই যেন প্রকৃতির নিঝুমতার মাঝে আবৃতি করতে থাকে --
:
"একটি নক্ষত্র আসে; তারপর একা পায়ে চ'লে
ঝাউয়ের কিনার ঘেঁষে হেমন্তের তারাভরা রাতে
সে আসবে মনে হয়; - আমার দুয়ার অন্ধকারে
কখন খুলেছে তার সপ্রতিভ হাতে!
হঠাৎ কখন সন্ধ্যা মেয়েটির হাতের আঘাতে
সকল সমুদ্র সূর্য সত্বর তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাত্রি হতে পারে
সে এসে এগিয়ে দেয়; 
শিয়রে আকাশ দূর দিকে
উজ্জ্বল ও নিরুজ্জ্বল নক্ষত্র গ্রহের আলোড়নে
অঘ্রানের রাত্রি হয়;
এ-রকম হিরন্ময় রাত্রি ইতিহাস ছাড়া আর কিছু রেখেছে কি মনে।
শেষ ট্রাম মুছে গেছে, শেষ শব্দ, কলকাতা এখন
জীবনের জগতের প্রকৃতির অন্তিম নিশীথ;
চারিদিকে ঘর বাড়ি পোড়ো-সাঁকো সমাধির ভিড়;
সে অনেক ক্লান্তি ক্ষয় অবিনশ্বর পথে ফিরে
যেন ঢের মহাসাগরের থেকে এসেছে নারীর
পুরোনো হৃদয় নব নিবিড় শরীরে"।



লেখাটি ফেসবুকে দেখতে চাইলে নিচের লিংকে যান প্লিজ